তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান—তিন মুসলিম পরাশক্তির মধ্যে গড়ে উঠতে যাচ্ছে নতুন সামরিক ও নিরাপত্তা জোট, যা অনেকেই ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের উদ্যোগে প্রস্তাবিত এই নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হতে তুরস্কের সঙ্গে আলোচনাও চলছে বলে জানিয়েছে বিবিসি ও ব্লুমবার্গসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
নতুন জোটের কাঠামো ন্যাটোর বিখ্যাত ‘সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা নীতির’ আদলে তৈরি করা হচ্ছে। অর্থাৎ—এক সদস্য রাষ্ট্রের ওপর হামলা মানেই সব সদস্যের বিরুদ্ধে আগ্রাসন ধরা হবে।
প্রাথমিকভাবে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল আলোচনাটি। তবে দ্রুত অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়ে এখন তা আঙ্কারার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। আঙ্কারা–ভিত্তিক থিংকট্যাংক টেপাভের কৌশলবিদ নিহাত আলি ওজচান জানিয়েছেন—
- সৌদি আরব দেবে অর্থনৈতিক শক্তি,
- পাকিস্তান দেবে তাদের পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও জনবল,
- আর তুরস্ক যুক্ত করবে সামরিক দক্ষতা এবং উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প।
ওজচান আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ক্রমেই নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার পরিবর্তিত সংঘাত–বাস্তবতা তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে কাছাকাছি নিয়ে আসছে। আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে তাই একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা জোট গঠন তাদের কাছে স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পদক্ষেপ।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, চলতি সপ্তাহে আঙ্কারায় প্রথমবারের মতো তুরস্ক–সৌদি আরব–পাকিস্তানের যৌথ নৌবাহিনী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে তিন দেশই সমন্বিত সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করে। জোটের সম্ভাব্য গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয় তুরস্কের ন্যাটো–অভিজ্ঞতা। যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী রয়েছে আঙ্কারার হাতে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও তুরস্ক উভয় দেশই ইরানকে ঘিরে সমান উদ্বেগে থাকলেও সামরিক সংঘাত নয়, বরং কূটনৈতিক সমন্বয়কে গুরুত্ব দেয়। একইসঙ্গে উভয় দেশই সুন্নি নেতৃত্বাধীন একটি স্থিতিশীল সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে।
তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বহু দশকের।
- পাকিস্তানি নৌবাহিনীর জন্য করভেট যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করছে তুরস্ক,
- পাকিস্তানের এফ–১৬ বহর আধুনিকায়ন করেছে,
- ড্রোন প্রযুক্তিও ভাগাভাগি করছে তুরস্ক–সৌদি–পাকিস্তান তিন দেশই।
এছাড়া তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ প্রকল্পেও সৌদি ও পাকিস্তানকে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা আলোচনা এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ভারত–পাকিস্তানের মাঝে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর মে মাসে নতুন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত চার দিনের টানটান উত্তেজনার সময় তুরস্ক প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল বলেও জানায় ব্লুমবার্গ।
তিন দেশের কৌশলগত স্বার্থ এক হওয়ায় বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট মধ্যপ্রাচ্য–দক্ষিণ এশিয়া–আফ্রিকার নিরাপত্তা চিত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। তুরস্কের সামরিক দক্ষতা, সৌদির আর্থিক প্রভাব ও পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা—এই তিন শক্তির সমন্বয়ই অনেককে ভাবাচ্ছে, সত্যিই কি তৈরি হচ্ছে ‘ইসলামিক ন্যাটো’?

