অবশেষে নতুন করে হচ্ছে মুন্সিগঞ্জ শহর- শ্রীনগর সড়ক, ১৩৫৯ কোটি টাকা ব্যায় অনুমোদন
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একনেকের (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) অনুমোদন পেল মুন্সিগঞ্জ জেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুন্সিগঞ্জ শহর–শ্রীনগর সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প। প্রায় ১ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প মুন্সিগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার অনুষ্ঠিত একনেকের চলতি অর্থবছরের ৮ম সভায় প্রকল্প তালিকার ২ নম্বরে স্থান পায়—
‘মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগাধীন ৩টি আঞ্চলিক মহাসড়ক ও ১টি জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি।
এই একটিমাত্র প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং, শ্রীনগর, সিরাজদিখান, টংগিবাড়ী ও সদর উপজেলা—সব মিলিয়ে পুরো জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি হবে মুন্সিগঞ্জের অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়নের একটি মাইলফলক প্রকল্প।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একনেকের অনুমোদনের পর আগামী তিন মাসের মধ্যেই টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের জুন মাস থেকে নির্মাণকাজ শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে সাড়ে তিন বছর, ফলে ২০২৯ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১,৩৫৯ কোটি ২৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
মুন্সিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ মাহমুদ সুমন বলেন,
“এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মুন্সিগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। পুরো জনপদের চিত্রই বদলে যাবে।”
অন্যদিকে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজমুস হোসেন সাকিব জানান, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুন্সিগঞ্জের পুরনো বাসস্ট্যান্ড থেকে শ্রীনগর উপজেলার ছনবাড়ি পর্যন্ত সড়কটিকে আধুনিক মান ও প্রয়োজনীয় প্রশস্ততায় উন্নীত করা।
আরও পড়ুন: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় বাড়ল সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি অনুমোদনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন
স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা এবং মুন্সিগঞ্জের কৃতি সন্তান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
পাশাপাশি শিল্প, গণপূর্ত ও এলজিআরডি উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান-এরও রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান।
প্রায় ছয় বছর আগে প্রকল্পটির প্রাথমিক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। দফায় দফায় যাচাই-বাছাই শেষে এটি পরিকল্পনা কমিশনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে অন্যান্য প্রকল্পের সঙ্গে এটিও পুনরায় যাচাইয়ের জন্য ফেরত পাঠানো হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে পুনরায় উপস্থাপনের পর অবশেষে একনেকের অনুমোদন মিলল।
প্রকল্পের আওতায় মোট ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ মুন্সিগঞ্জ–শ্রীনগর সড়ক উন্নয়ন করা হবে। এর মধ্যে—
- হাতিমারা থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত ২০.৪০ কিলোমিটার সড়ক ৩৫ ফুট প্রশস্ত করা হবে
- মুক্তারপুর থেকে হাতিমারা পর্যন্ত প্রায় ৪.৫ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত হবে
- মুক্তারপুর থেকে পুরনো বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার সড়ক ২৪ ফুট প্রশস্ত করা হবে
যানজট নিরসনে প্রকল্পে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নির্মাণ করা হবে—
- ৪টি ওভারপাস: মুক্তারপুর, সিপাহিপাড়া, বেতকা চৌরাস্তা ও ইছাপুরা
- ৬টি আন্ডারপাস: হাতিমারা, আব্দুল্লাহপুর চৌরাস্তা, মালখানগর চৌরাস্তা, কুন্ডেরবাজার, সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে এবং কুসুমপুর এলাকায়
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা যানবাহনের চাপ কমাতে এই সড়ক গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করবে। এতে ঢাকা আউটার রিং রোড ও জাতীয় মহাসড়ক এন-১ ব্যবহার না করেই দক্ষিণাঞ্চল ও চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সহজ হবে।
একই সঙ্গে কৃষিজ ও শিল্পজাত পণ্য পরিবহন আরও দ্রুত ও সহজ হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, একনেক অনুমোদিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মুন্সিগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন আধুনিক হবে, তেমনি বাণিজ্য, অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আসবে বড় পরিবর্তন—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা।

