মানব মস্তিষ্কের বিস্ময়কর ক্ষমতা নিয়ে নতুন আলো ফেলেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ও নিউরোসায়েন্টিস্ট চরণ রঙ্গনাথ। তার সাম্প্রতিক বই ‘হোয়াই উই রিমেম্বার’–এ তিনি দাবি করেছেন, ভুলে যাওয়া কোনো দুর্বলতা নয়; বরং মানব মস্তিষ্কের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী একটি প্রক্রিয়া।
রঙ্গনাথ বলেন, আমরা প্রায়ই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হোঁচট খাই, কোনো তথ্য মনে না পড়লে নিজেকে দুর্বল ভাবি—কিন্তু বাস্তবে মস্তিষ্ক ইচ্ছাকৃতভাবেই অনেক কিছু ভুলে যায়, যাতে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে খুঁজে পাওয়া যায়।
“যদি আমরা সবকিছুই মনে রাখতাম, মস্তিষ্ক জঞ্জালে ভরে যেত”—রঙ্গনাথ
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি বাড়িতে সব জিনিস জমিয়ে রাখলে যেমন নোংরা হয়ে যায়, ঠিক তেমনি মস্তিষ্ক যদি সব স্মৃতি ধরে রাখে, তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খুঁজে বের করাই কঠিন হয়ে পড়বে। তাই মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনে স্মৃতি ঝেড়ে–মুছে ফেলে।
গত তিন দশক ধরে স্মৃতি, ভুলে যাওয়া এবং মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে গবেষণা করছেন রঙ্গনাথ। তার মতে, যেসব বিষয়কে আমরা স্মৃতির দুর্বলতা বলি—তার বেশিরভাগই আসলে মস্তিষ্কের অভিযোজনক্ষমতা, যা মানবজাতির টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য।
ভুলে যাওয়ার তিনটি বড় উপকারিতা
১. মস্তিষ্কের মানসিক নমনীয়তা বাড়ায়
সব তথ্য ধরে রাখলে মস্তিষ্ক জটিল হয়ে যেত। ভুলে যাওয়া মস্তিষ্ককে সদা–তরতাজা রাখে।
২. অপ্রয়োজনীয় তথ্য বাদ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি অটুট রাখে
রঙ্গনাথ বলেন, “দুই সপ্তাহ আগে যে হোটেলে ছিলেন, তার রুম নম্বর মনে রাখার প্রয়োজন নেই। কিন্তু নতুন কাজে লাগা তথ্য মস্তিষ্ক ধরে রাখে।”
৩. আত্মপরিচয় ও চিন্তাশক্তিকে তীক্ষ্ণ করে
স্মৃতি কখনোই নিখুঁত আর্কাইভ নয়—বরং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি।
ভুলের মাধ্যমে শেখাকে কেন কার্যকর বলে বিজ্ঞানীরা?
গবেষণায় দেখা গেছে, নিউরনের সংযোগ (synapses) শক্তিশালী বা দুর্বল হওয়ার ওপর স্মৃতি নির্ভর করে।
আপনি যখন কোনো তথ্য বারবার মনে করার চেষ্টা করেন, তখন মস্তিষ্ক ভুলগুলো শনাক্ত করে এবং প্রয়োজনীয় সংযোগগুলো আরও মজবুত করে।
এ কারণেই—
- গুগল ম্যাপে না দেখে নিজের গাড়ি চালিয়ে এলাকা চেনা
- চিত্রনাট্য শুধু পড়ার বদলে অভিনয় করা
—এসব পদ্ধতি অনেক বেশি কার্যকর।
বয়স বাড়লে ভুলোমনা হওয়ার আসল কারণ
রঙ্গনাথের মতে, বয়সের সঙ্গে ভুলে যাওয়ার আসল সমস্যা স্মৃতি তৈরির ক্ষমতা নয়, বরং মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা।
সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ায় অপ্রাসঙ্গিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতির জায়গা দখল করে নেয়।
স্মৃতি শক্তিশালী করতে রঙ্গনাথের ৩টি বৈজ্ঞানিক পরামর্শ
১. স্বাতন্ত্র্য (Distinctiveness)
যে স্মৃতি চোখে পড়ে—দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ বা অনুভূতির সঙ্গে জড়িত—তা সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়।
২. স্মৃতির বিন্যাস (Organisation)
‘মেমোরি প্যালেস’ কৌশল ব্যবহার করে নতুন তথ্যকে পুরোনো তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করলে স্মৃতি অনেক শক্তিশালী হয়।
৩. সূত্র বা ইঙ্গিত তৈরি করা (Cues)
কোনো গান বা গন্ধ যেমন হঠাৎ পুরোনো স্মৃতি জাগিয়ে তোলে—তেমনি ইঙ্গিত ব্যবহার করলে স্মৃতি সহজে ফিরে আসে।
কেন স্মৃতি মাঝে মাঝে ভুল তথ্য ধারণ করে?
১. ‘স্কিমা’ বা মানসিক কাঠামো
মস্তিষ্ক পুরোনো অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে নতুন স্মৃতি সাজায়। ফলে কখনো কিছু ভুল তথ্য মিশে যায়।
২. সময়ের সঙ্গে স্মৃতির পরিবর্তন
পুরোনো স্মৃতিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে মস্তিষ্ক কখনো ভুল বা অতিরিক্ত তথ্য যোগ করে।
যৌথ স্মৃতি: অন্যদের সঙ্গে কথা বললেই বদলে যায় স্মৃতি
রঙ্গনাথ বলেন, কোনো ঘটনা শেয়ার করার সময় গল্প সাজানোর প্রক্রিয়াতেই স্মৃতি বদলে যায়। অন্য কেউ ভুল তথ্য দিলে সেটিও স্মৃতিতে ঢুকে যেতে পারে।
রঙ্গনাথ জানান, বইটি লিখতে গিয়ে নিজের স্মৃতি যত্নে রাখার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। এখন তিনি নিয়মিত ব্যায়াম করেন, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস মেনে চলেন, যাতে বৃদ্ধ বয়সে মানসিক সুস্থতা বজায় থাকে।
চরণ রঙ্গনাথের এই গবেষণার ভিত্তিতে বিজ্ঞান লেখক ডেভিড রবসন সাক্ষাৎকার নেন, যা পরে বিবিসির প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়।

