ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে গত ৮ জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে কঠোর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। সরকার ঘোষিত এই ডিজিটাল অন্ধকারের মধ্যে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র কার্যকর জানালা হয়ে উঠেছে ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক।
রয়টার্স ও আল–জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, স্পেসএক্স বর্তমানে ইরানি ব্যবহারকারীদের জন্য বিনামূল্যে স্টারলিংক সেবা সক্রিয় করেছে। যদিও দেশটিতে স্টারলিংক ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, গত দুই বছরে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টার্মিনাল গোপনে ইরানে ঢুকে গেছে। এখন এই ছোট স্যাটেলাইট টার্মিনালগুলোই বিক্ষোভের ভিডিও, ছবি ও মাঠের তথ্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
স্টারলিংকের প্রধান শক্তি হলো এর বিকেন্দ্রিকৃত অবকাঠামো। প্রথাগত ইন্টারনেটের মতো মাটির নিচের ক্যাবল বা সেলফোন টাওয়ারের ওপর নির্ভর না করে, এটি পৃথিবীর ৫৫০ কিলোমিটার ওপরে থাকা হাজার হাজার ছোট স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি সংকেত পাঠায়। ব্যবহারকারীর হাতে কেবল একটি ছোট রিসিভার থাকলেই তারা ব্ল্যাকআউট উপেক্ষা করে অনলাইন হতে পারছেন।
ব্ল্যাকআউটের সময় ইরানিরা প্রক্সি ও VPN এর পাশাপাশি স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে ভর করে সরকারের নিয়ন্ত্রিত গেটওয়ে বাইপাস করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এই নিয়ন্ত্রণ ভাঙা ঠেকাতে ইরানও এক কঠোর পাল্টা অভিযানে নেমেছে। নিরাপত্তা বাহিনী রাশিয়া ও চীন থেকে আনা সামরিক-গ্রেড জ্যামার দিয়ে স্টারলিংকের সিগন্যাল বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে।
আরো পড়ুন:
ইন্টারনেট নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আমির রাশিদি জানান, তেহরানের মতো বড় শহরগুলোতে স্টারলিংকের ডেটা প্যাকেট লস ৩০% থেকে ৮০% পর্যন্ত পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, ড্রোন ব্যবহার করে আবাসিক ভবনের ছাদে স্থাপন করা টার্মিনাল শনাক্ত করার অভিযান চলছে। এর আগে ২০১৫ সালের শেষে ইরান নতুন একটি আইন পাস করে, যেখানে স্টারলিংক ব্যবহারকে ‘ইসরাইলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি’ অপরাধের পর্যায়ে ফেলা হয়। এর শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইলন মাস্কের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনার কথা জানিয়েছেন এবং ইরানিদের নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
অন্যদিকে ইরান সরকার এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে অভিযোগ করেছে। তারা দাবি করছে, স্টারলিংক তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে। এ পরিস্থিতিতে একদিকে স্টারলিংক সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে জ্যামিং প্রতিরোধে কাজ করছে, অন্যদিকে ইরান নিজস্ব ‘ন্যাশনাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক’ চালুর মাধ্যমে বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে অগ্রসর হচ্ছে।
ডিজিটাল যুদ্ধের এই সময়টিতে সাধারণ ইরানিরা প্রতিদিনই জীবন বাজি রেখে তথ্য আদান-প্রদান করছেন—সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তিগত বাধাকে পেরিয়ে সত্য তুলে ধরছেন বিশ্বমঞ্চে।
সূত্র: আল-জাজিরা

