ঢাকার সাভারে ভবঘুরে ছদ্মবেশে সাত মাসে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া মশিউর রহমান সম্রাটের আসল নাম সবুজ শেখ। মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার বাসিন্দা এই ব্যক্তি প্রতিবেশীর নামের সঙ্গে মিল থাকায় নিজের নাম পরিবর্তন করেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
সাভার থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন জানান, গ্রেপ্তারকৃত সম্রাটের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে গিয়ে জানা যায়, তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলার হলুদিয়া ইউনিয়নের মৌছামান্দ্রা গ্রামের পান্না শেখের ছেলে সবুজ শেখ।
পুলিশ জানায়, সম্রাটের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া যায়নি। ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাই করেও তার পূর্ব অপরাধ ইতিহাস শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কারণ তিনি বিভিন্ন সময় টাইগার সম্রাট, মশিউর রহমান সম্রাটসহ একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।
সাভার থানা এলাকায় সম্রাটকে স্থানীয়রা মানসিক ভারসাম্যহীন বা পাগল হিসেবেই চিনতেন। এমনকি তিনি থানার বিভিন্ন কর্মকর্তা ও সদস্যদের মোবাইল ফোনে নিয়মিত অকারণে কল করতেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন।
তিনি বলেন, পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্দেহের তালিকায় সম্রাটকে আনা হলেও তাকে অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করা কঠিন ছিল। কারণ সমাজে তিনি পাগল হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
আরও পড়ুন : টঙ্গিবাড়ীতে বিএনপির দুই গ্রুপের দফায় দফায় সংঘর্ষ, বাজার এলাকা রণক্ষেত্র, আহত একাধিক
১৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায়—দুইজনকে পুড়িয়ে হত্যার একদিন আগে—সম্রাট পুলিশকে ফোন করে দুটি লাশ উদ্ধারের কথা জানান। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে পুলিশ ওই কমিউনিটি সেন্টারে অভিযান চালায়। সেখানে এক নারীকে শুয়ে থাকতে এবং আশপাশে সম্রাটকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়।
তল্লাশির সময় সম্রাটের ব্যাগে সাভার মডেল থানা ও শেরেবাংলা নগর থানার কর্মকর্তাদের নাম ও মোবাইল নম্বরের তালিকা পাওয়া যায়। পরে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তার সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হলে তাকে আটক করা হয়।
দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট ছয়জনকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি হত্যা শব্দ ব্যবহার না করে প্রতিটি ঘটনাকে থার্টি ফোর বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়—ছয়জনকে থার্টি ফোর করেছি।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৪ জুলাই থেকে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ছয়জন হত্যার ঘটনায় পাঁচটি পৃথক মামলা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুইজন পুরুষ, তিনজন নারী এবং একজনের পরিচয় এখনও নিশ্চিত হয়নি।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিকভাবে হত্যার নির্দিষ্ট কোনো মোটিভ পাওয়া যায়নি। তবে নিহত সবাই ছিলেন ভবঘুরে বা মানসিকভাবে অসুস্থ, যারা মূলত রাস্তায় রাত যাপন করতেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট দাবি করেন, তিনি তার এলাকায় পাগল শ্রেণীর কাউকে থাকতে দেবেন না—এই চিন্তা থেকেই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। যদিও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি হাতে পেলে প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আরও পড়ুন : টঙ্গীবাড়ীতে চর থেকে ঘাস কেটে ফেরার পথে যুবককে কুপিয়ে মোবাইল-টাকা ছিনতাই
সর্বশেষ পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় এক ভুক্তভোগীর পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তিনি তানিয়া আক্তার (২৫), রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা ও মৃত জসিম মিয়ার মেয়ে। তানিয়া অটিজম আক্রান্ত ও মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন এবং ১ জানুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন।
অনলাইনে ছবি ও ভিডিও দেখে তার মা জুলেখা বেগম থানায় এসে পরিচয় নিশ্চিত করলে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সবুজ শেখের মা মমতাজ বেগম বলেন, সে অনেক বছর বাড়িতে আসে না। এক মাস আগে হঠাৎ এসেছিল। কারও সঙ্গে কথা বলে না, নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলে। পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল, বিয়ের পর আরও বেশি অসংলগ্ন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও জানান, সবুজ পরিবারকে নিজের বলে স্বীকার করত না এবং বলত—তারা নাকি তার সৎ মা-বাবা।

